হতাশ কুমিল্লা, উৎফুল্ল নারায়ণগঞ্জ

LaksamDotKom
By LaksamDotKom নভেম্বর ২৬, ২০১৬ ১১:০৯

হতাশ কুমিল্লা, উৎফুল্ল নারায়ণগঞ্জ

সোহরাব হাসান : ঢাকার বাংলাদেশ আর ঢাকার বাইরের বাংলাদেশ এক নয়। দূরত্ব যত কমই হোক, বাইরে গেলে ঢাকার শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ থেকে মুক্তি মেলে। পা বাড়ালে একটু খোলা জায়গা, চোখ ফেরালে এক টুকরো আকাশের দেখা পাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে ঘরের পাশে আরশিনগর নারায়ণগঞ্জ। মেয়র হানিফ উড়ালসড়ক নির্মিত হওয়ার পর যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে। চাকরি, লেখাপড়া ও ব্যবসার প্রয়োজনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ আসা-যাওয়া করেন। হেমন্তেও শীত না আসা সকালে যখন আমরা উৎসব পরিবহনের বাসে চাষাঢ়া মোড়ে নামি, যানজটে আক্রান্ত পুরো এলাকা। রিকশা, বাস, অটো-ইজিবাইকের উপদ্রব। কিন্তু ফুটপাতগুলো বেশ প্রশস্ত, হাঁটতে গেলে ঢাকার মতো গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে না। চাষাঢ়া মোড় থেকে বঙ্গবন্ধু সড়ক ধরে কয়েক পা এগোলেই নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব। আমরা যখন প্রেসক্লাবে, তখন রাস্তার পাশে নাসিরনগরের সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন চলছিল। আয়োজক সিপিবি, বাসদ, ন্যাপ, ছাত্র ইউনিয়নসহ কয়েকটি সংগঠন। কিন্তু আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো বড় দল কোনো কর্মসূচি নেয়নি।

11262016_04_laksam_comilla_abu_taherসম্প্রতি কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে তাঁদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা ছিল এবং এখনো আছে। নির্বাচনের দিন-তারিখ ঠিক হওয়ায় নারায়ণগঞ্জের মানুষ যেমন উৎফুল্ল, তেমনি তফসিল না পেয়ে কুমিল্লাবাসী হতাশ। অনেকের ধারণা, ভালো প্রার্থী না থাকায় ক্ষমতাসীনেরা চাইছিলেন না নির্বাচনটি এখন হোক। বিএনপির সমর্থক কাউন্সিলরের রিট তাদের সুবিধা করে দিয়েছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মেয়াদ শেষ হচ্ছে ফেব্রুয়ারিতে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী পরীক্ষায় বারবার ফেল করা ইসির জন্য নারায়ণগঞ্জই সম্ভবত শেষ পরীক্ষা।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দুই সিটিতে দুই প্রধান দলের অবস্থান বিপরীতমুখী। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের অবস্থান সংহত, কিন্তু কুমিল্লায় দুর্বল। আর কুমিল্লায় বিএনপি শক্ত অবস্থানে থাকলেও নারায়ণগঞ্জে অসংগঠিত। কেন্দ্রের আগ্রহ সত্ত্বেও নারায়ণগঞ্জে বিএনপির জনপ্রিয় নেতা তৈমুর আলম খন্দকার সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হননি। দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন নারায়ণগঞ্জ বারের সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান। সাত খুনের মামলায় তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।

নানা প্রতিকূলতা কাটিয়ে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। ওসমান পরিবারসহ আওয়ামী লীগের আরও কারও কারও বিরোধিতা উপেক্ষা করে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা তাঁকেই মনোনয়ন দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘খেলায় জিততে হলে একজন স্ট্রাইকার প্রয়োজন। আইভী নারায়ণগঞ্জের স্ট্রাইকার। তাঁকে জিতিয়ে আনার দায়িত্ব দলের সব নেতা-কর্মীর।’ এরপরও দলের বিভক্তি কতটা কাটবে বলা কঠিন। আইভীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় শামীম ওসমানের সমর্থকেরা কেউ ছিলেন না। তবে তাঁর ভরসা সাধারণ কর্মী ও নির্দল মানুষ, যাঁরা গত নির্বাচনেও তাঁর পাশে ছিলেন।

কুমিল্লায় বিএনপিতে মেয়র মনিরুল হকের কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এক দশকেরওবেশি সময় তিনি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী আছেন প্রায় অর্ধডজন। আমেরিকান চেম্বারের সাবেক সভাপতি আফতাব উল ইসলাম, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সভাপতি আলফানুল হক রিফাত, ভিক্টোরিয়া কলেজের সাবেক ভিপি নূর উর রহমান মাহুমুদ তানিম, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম ও নারী কাউন্সিলর আঞ্জুম সুলতানার নাম আলোচনায় আছে।

কুমিল্লা আওয়ামী লীগে আফজল খান ও বাহাউদ্দিন বাহারের বিরোধ বেশ পুরোনো। গত নির্বাচনে আফজল খান প্রার্থী হয়ে ৩০হাজার ভোটে হেরেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা জানতে চাইলে বাহার বলেন, তিনি সাত বছর ধরে সাংসদ থাকলেও কোনো কমিটিতে নেই। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দল যোগ্য প্রার্থী দিলে জিতবে। কুমিল্লায় আওয়ামী লীগে কোন্দল থাকলেও সরকারদলীয় সাংসদ ও বিএনপিদলীয় সিটি মেয়রের মধ্যে বেশ সদ্ভাব আছে। দুজনই দাবি করেছেন, এ ভাব ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, কুমিল্লাবাসীর স্বার্থে। সিটি নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকলেও নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন বলেছেন, সবকিছুই নির্ভর করছে সরকারের ওপর। হাইকোর্ট তো নির্বাচন বন্ধ করতে বলেননি। সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে নির্বাচন করতে বলেছেন। এক মাসের মধ্যেই সেটি সম্ভব।

স্বাদে-গুণে বেশ কম হলেও কুমিল্লার প্রায় সব মিষ্টির দোকানের নাম মাতৃভান্ডার। কাপড়ের দোকানেও খাদি নামটি নানা বিশেষণে যুক্ত। সেখানে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু রাজনীতিকদের মতো রেষারেষি নেই। রসমালাই ও খাদি—দুটোই কুমিল্লার গর্ব। কুমিল্লার গর্ব করার মতো আরও অনেক কিছু আছে। নবাব ফয়জুননেসা চৌধুরানীর জন্ম কুমিল্লার লাকসামে, যিনি বেগম রোকেয়ারও অনেক আগে নারীশিক্ষার কথা বলেছেন। নিজে জমিদারি চালিয়েছেন, জনগণের কল্যাণে অনেক প্রতিষ্ঠান করেছেন। সাবেক আইসিএস কর্মকর্তা আখতার হামিদ খান এই কুমিল্লাতেই বার্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতি গবেষণার প্রাণকেন্দ্র হয়ে আছে।

ঢাকার বাইরে আরও অনেক শহরের মতো নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লায় গণপরিবহন নেই। অথচ নারায়ণগঞ্জে ১০ লাখ লোকের বাস, কুমিল্লায় ৫ লাখ। ফলে অটো, ইজিবাইক কিংবা রিকশাই ভরসা। কুমিল্লায় যত অটো, তার কয়েক গুণ ইজিবাইক। এসব ইজিবাইকের কোনো নিবন্ধন নেই, নেই চালকদের প্রশিক্ষণ। সেপ্টেম্বরে ইজিবাইকের দুর্ঘটনায় দুজন মারাও গেছেন সেখানে। তারপরও কর্তৃপক্ষ উদাসীন। দুই শহরের বাসিন্দারাই মনে করেন, যানজট ও জনগণের ভোগান্তি কাটাতে পাবলিক পরিবহনের বিকল্প নেই। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহল সেটি হতে দেবে কি না সন্দেহ।

নারায়ণগঞ্জের যেকোনো সড়কে বা ওয়ার্ডে গেলে সিটি করপোরেশনের কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। শহরের প্রায় সব সড়ক প্রশস্ত। খালগুলো দখলমুক্ত হয়েছে। ড্রেনেজব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। জলাবদ্ধতাও কমেছে। মেয়রের আক্ষেপ, সংস্কৃতিসেবীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কাজটি আরও আগে শুরু করলে ভালো হতো। মেয়র ভবনের সামনে দেখলাম, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি ট্রাক। স্থানীয় এক সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা করলাম, সড়কের ওপর ট্রাকস্ট্যান্ড কেন? বললেন, প্রভাবশালী মহল এখানে ট্রাকস্ট্যান্ড বসিয়ে মাসে লাখ লাখ টাকা আদায় করে। সিটি করপোরেশন প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়েও এটি সরাতে পারেনি। তবে আশার খবর, মেয়রের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ১০ দিনের মধ্যে ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জে কী কী আছে, সেই তালিকার আগে কী কী নেই, সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জে মানসম্মত আবাসিক হোটেল নেই, অথচ দেশের নিট পোশাকের ৮০ শতাংশ উৎপাদিত হয় সেখানে। বিদেশি ক্রেতারা নারায়ণগঞ্জে এলেও দিন থাকতে তাঁদের ঢাকায় ফিরে যেতে হয়। হোটেল না থাকায় খান সাহেব ওসমান আলী ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জে কোনো সরকারি মেডিকেল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় নেই। অথচ দেশের অধিকাংশ জেলা শহরে সরকারি মেডিকেল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। নারায়ণগঞ্জের মানুষ মনে করেন, তাঁরা প্রদীপের পাশে অন্ধকারেই রয়ে গেছেন।

ঢাকায় যেমন বিউটি বোর্ডিং, কলকাতায় কফি হাউস, তেমনি নারায়ণগঞ্জে বোস কেবিন বিখ্যাত। বোস কেবিনের প্রতিষ্ঠাতা নৃপেন্দ্র বসু। এখন তাঁর নাতি তারক বোস দেখাশোনা করেন। এই বোস কেবিন প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজনীতি ছিল—নৃপেন্দ্র বসু ওরফে ভুলুবাবু স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথমে এটি ছিল ফলপট্টিতে, ১ নম্বর রেলগেটের কাছে। ১৯৮৮ সালে এটি চেম্বার রোডে স্থানান্তরিত। নতুন নাম নিউ বোস কেবিন। ১৯৩৭ সালে সুভাষ চন্দ্র বসুকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নেওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ থানায় নিয়ে আসা হয়। এ সময়ে বোস কেবিনের মালিক ভুলুবাবু বোস কেবিন থেকে চা পাঠিয়ে তাঁকে খাওয়ান। সুভাষ বসু তাঁর চা খেয়ে নাকি খুব প্রশংসা করেছিলেন। সেই গল্প ভুলুবাবু যে কতজনের কাছে বয়ান করেছেন, তার হিসাব নেই।

সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়াই কুমিল্লাবাসীর একমাত্র দুঃখ নয়। তাঁরা মনে করেন, ষাটের দশকে কুমিল্লা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। ঢাকা ও রাজশাহীর পর তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লায়। কিন্তু তৎকালীন জাতীয় পরিষদের স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী এক দিনের জন্য প্রেসিডেন্ট হয়ে সেটি চট্টগ্রামে নিয়ে যান (কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে অনেক পরে)। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত বিমানবন্দরটি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। কুমিল্লায় ইপিজেড করার সময় বলা হয়েছিল, বিমানবন্দরটি ফের চালু করা হবে। এখনো হয়নি।

কুমিল্লা বিভাগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালে, বর্তমান সাংসদ বাহাউদ্দিন বাহারের নেতৃত্বে। চলতি বছর ২৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ বিভাগ ঘোষণাকালে চট্টগ্রাম বিভাগ ভেঙে কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলকে নিয়ে একটি এবং ঢাকা বিভাগ ভেঙে ফরিদপুরে আরও একটি বিভাগ করা যায় কি না, সেটি পরীক্ষা করে দেখতে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রাম বিভাগ ভাগ হলে নতুন বিভাগ কুমিল্লাতেই হওয়ার কথা। কিন্তু ১০ মাসেও সেই ঘোষণা না আসায় কুমিল্লাবাসীর মন খারাপ।

এত দুঃসংবাদের মধ্যেও একটি সুসংবাদ হলো, কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী শচীন দেববর্মনের বাড়িটি উদ্ধার করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। সরেজমিন ঘুরে দেখলাম, শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির সংস্কারকাজ ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা যায়, ডিসেম্বর নাগাদ উদ্বোধন করা যাবে। কুমিল্লার কৃতী সন্তান শচীনকে যে বাংলাদেশ ভোলেনি, এটা তারই প্রমাণ।

কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ—একযাত্রায় দুই ফল। দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ডিসেম্বরে। নির্বাচন কমিশন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। ২২ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ। কিন্তু কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনিশ্চিত। একজন কাউন্সিলরের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে নির্বাচন করার নির্দেশ দিয়েছেন। সীমানাবিরোধ নিয়ে বাংলাদেশে অনেক নির্বাচনই বছরের পর বছর আটকে থাকে বা আটকে রাখা হয়। কুমিল্লায় কী হয়, সেটাই দেখার বিষয়।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

(32)

LaksamDotKom
By LaksamDotKom নভেম্বর ২৬, ২০১৬ ১১:০৯
Write a comment

No Comments

No Comments Yet!

Let me tell You a sad story ! There are no comments yet, but You can be first one to comment this article.

Write a comment
View comments

Write a comment

Leave a Reply