রক্ষনাবেক্ষন ও সংস্কারের অভাবে বিলীন হবার পথে লাকসামের নবাব ফয়েজুন্নেছা চৌধুরানীর নবাববাড়ী

LaksamDotKom
By LaksamDotKom ডিসেম্বর ১, ২০১৭ ১৬:৫৫

রক্ষনাবেক্ষন ও সংস্কারের অভাবে বিলীন হবার পথে লাকসামের নবাব ফয়েজুন্নেছা চৌধুরানীর নবাববাড়ী

এমএসআই জসিম, লাকসাম : এশিয়ার মহিয়সী নারী বাংলাদেশের গৌরব লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে কেউ স্মরণ করে না। তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি বিলীন হবার পথে। লাকসামের ডাকাতিয়া নদীর উত্তরতীরে খান বাহাদুর বাড়িতে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জম্ম গ্রহণ করেন। নবাব ফয়জুন্নেছার জম্ম ১৮৩৪ সালে। রূপজালাল নামে গ্রন্থ বাংলাভাষায় লিখিত মাহিলাদের মধ্যে সর্বাগ্রে প্রকাশিত বই। মহিলা লেখিকাদের পথ প্রদর্শক ছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা। সাহিত্যের ইতিহাসে এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত।

নবাব ফয়জুন্নেছার রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ তার স্বামী গাজী চৌধুরীর নামে উৎসর্গ করেন। নবাব ফয়জুন্নেছার পিতার নাম সৈয়দ আহম্মদ আলী চৌধুরী। তার মাতার নাম আরফান্নেছা চৌধুরীরানী। ফয়জুন্নেছার ভাই বোনদের মধ্যে তিনিই জমিদারি পরিচালনার প্রশিক্ষণ পান। তৎকালীন হোমনাবাদ পরগনার বিরাট জমিদারি তিনি পরিচালনা করেন। নবাব ফয়জুন্নেছার গৃহ শিক্ষক ছিলেন তাজ উদ্দিন। ১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ১৩১০ বাংলা ২০ আশ্বিন নবাব ফয়জুন্নেছা ইন্তেকাল করেন।

তার জমিদারীর ১১টি কাচারির মধ্যে প্রত্যেকটির পাশে বিশুদ্ধ পানির জন্য পুকুর কাটান এবং মক্তব ও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি ইসলামী কায়দায় বোরকা পড়ে পালকিতে করে প্রত্যেকের সুখ-দুঃখ দেখতে গ্রামে গ্রামে যান। বালিকা বিদ্যালয় কালের সাক্ষ্য বহন করেছে। নবাব বাড়ীর বালিকা বিদ্যালয়টি কালক্রমে লাকসাম ফয়জুন্নেছা ও বদরুন্নেছা যুক্ত উচ্চ বিদ্যালয় (বি.এন হাই স্কুল) রূপ নিয়েছে। তৎকালের মাদ্ররাসা আজ লাকসাম নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ হিসেবে এলাকায় শিক্ষার দ্বার উম্মোচন করছে। লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বাংলাদেশ তথা সমগ্র এশিয়া অতপর বিশ্বে তার নাম ছড়িয়ে রয়েছে। তার নাম গুণকীর্তন করে দেশের মানুষ ধন্য হচ্ছে। তৎকালীণ ব্রিটিশ সরকারের রানী লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছাকে বেগম উপাধিতে ভূষিত করে।

 

সাহিত্য চর্চায় নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিভা দুনিয়ার মানুষ স্বীকার করেছে। এক তথ্যে জানা যায় গাজী চৌধুরী প্রথম বিয়ে করেন বেগম নজমুন্নেছাকে। সতীন যাতনায় অতিষ্ঠ হয়ে ফয়জুন্নেছা বাকশার গ্রামে অল্প কিছুদিন থেকে পরে লাকসামের পশ্চিমগাঁওতে স্থায়ী বসবাস করেন। শেষ বয়সে গাজী চৌধুরী দারুন ব্যাথা বেদনায় কুমিল্লা শহরের মীর বাড়ীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের গৌরব নবাব ফয়জুন্নেছার স্বামীর বাড়ী বরুড়া উপজেলার বাকশার গ্রামে। বর্তমানে ধ্বংসের প্রদীপ হাতে দাড়িয়ে রয়েছেন সৈয়দ এনায়েত উল হক চৌধুরী।

নবাব ফয়জুন্নেছার দুই মেয়ের মধ্যে বদরুন্নেছা চৌধুরানীকে পশ্চিমগাঁওতে এবং সৈয়দা আসাদুন্নেছা চৌধুরানীকে বিয়ে দেন হবিগঞ্জ জেলার পইল জমিদার সৈয়দ ওয়াসেকুল হক এর সঙ্গে। কুমিল্লা শহরে ১৮৭৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা দুটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শহরের পূর্ব প্রান্তে নাজুয়া দীঘির পাড়ে প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং অপরটি বাদুরতলাতে উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। রংপুরের বেগম রোকেয়ার সাত বছর পূর্বে লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং দুই বছর পর স্যার সৈয়দ আহম্মদ আলী ১৮৭৫ সালে প্রথম মুসলিম কলেজ এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ পরবর্তী সময়ে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় খ্যাত স্থাপন করেন। নবাব ফয়জুন্নেছা ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রনায়িকা। অন্ধকার যুগের আলোর দিশারী মহিয়সী নারীর স্মৃতি এখন বহন করছে। নবাব ফয়জুন্নেছা মক্কা শরীফে মুসাফির খানা ও মুক্তব প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাওলাতিয়া মাদ্রাসা স্থাপনে তিনি সাহায্য করেন। ১৮৯৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্নে নবাব ফয়েজুন্নেছা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন।

নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারী ওয়াকফে দান করা। নবাব ফয়েজুন্নেছা রচিত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬খ্রিঃ। মিশ্র ভাষারীতির লেখা গদ্য ও পদ্যে তার গ্রন্থ রচনা করেন। রূপজালালের কাহিনী আদিভৌতি কথায় পরিপূর্ণ। তিনি ভাষা রীতিতে তৎসম শব্দের উপর বিশেষ ভাবে দুর্বলতা প্রকাশ করেন। তার রচনায় মধ্যযুগীয় ও পুথি সাহিত্যের প্রভাব ফুটে উঠে শীমাইল রাজপুত্র জালাল ও রাক্ষস পালিতা সাধু পুত্রী রূপভানুকে কেন্দ্র করে। লাকসামে নবাব ফয়েজুন্নেছা তার বাড়ীর পাশে ১০ গম্বুজ মসজিদ স্থাপন করেন। মসজিদের দক্ষিণ পাশে পারিবারিক কবরস্থানে নবাব ফয়েজুন্নেছার আতœার নশ্বরদেহ চিরদিনের জন্য সমাহিত রয়েছে।

নবাব ফয়েজুন্নেছা আর নেই আছে তার স্মৃতি, যে স্মৃতি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখনো আসেন প্রচুর দর্শনাথী। কিন্তু এশিয়ার মহিয়সী নারী বাংলাদেশের গৌরব নওয়াব ফয়জুন্নেছার জন্ম ও মৃত্যু দিবস দেশে পালিত হয়না। সরকারি বেসরকারি বা পারিবারিকভাবেও নওয়াব ফয়জুন্নেছার জন্ম মৃত্যু দিবস কেউ পালন করছে না। নবাববাড়ীর নবাব ভবন সরকারিভাবে রক্ষনাবেক্ষন ও সংস্কারের অভাবে আজ ধ্বংস ও বিলীন হবার পথে। দীর্ঘ কয়েক যুগ পার হলেও সরকারি ওয়াকফ অধিদপ্তর নওয়াব ফয়জুন্নেছার নবাব বাড়ীর তেমন কোন উন্নয়ন করেনি। বর্তমানে নওয়াব ফয়জুন্নেছার রেখে যাওয়া প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে।

এরমধ্যে নওয়াব ফয়জুন্নেছার চার ঘাটলা দীঘি বিভিন্নভাবে ভরাট ও হারিয়ে যেতে চলেছে। নবাব ফয়জুন্নেছার রেখে যাওয়া সম্পদ সরকারের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারের ওয়াকফ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দায়িত্বে থাকলেও কাগজে কলমে তা সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের গৌরব নারী মহীয়সী নবাব ফয়জুন্নেছার নবাব বাড়ীর বিশাল সম্পদ সরকারীভাবে রক্ষনা বেক্ষনসহ ঐতিহ্যবাহী এ নবাব বাড়ীকে পর্যটন কেন্দ্র করার দাবী জানান এলাকাবাসী। বেগম রোকেয়া সহ বিশিষ্ট নারীদের নানা ভাবে স্মরণ করা হলেও নারী শিক্ষার অগ্রদূত লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীকে কেউ স্মরণ করে না।

(6)

LaksamDotKom
By LaksamDotKom ডিসেম্বর ১, ২০১৭ ১৬:৫৫
Write a comment

No Comments

No Comments Yet!

Let me tell You a sad story ! There are no comments yet, but You can be first one to comment this article.

Write a comment
View comments

Write a comment

Leave a Reply