রাহুর কবলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন

LaksamDotKom
By LaksamDotKom আগস্ট ১৯, ২০১৭ ০৮:১৯

রাহুর কবলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন

এম. এস. দোহা: রাহুর কবলে জিম্মি দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন। প্রায় তিন দশক ঢাকসু, চকসু, জাকসু, রাকসু থেকে শুরু করে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই নির্বাচনের সুখবর। রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম কারখানা হিসেবে চিহ্নিত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ। যাকে আখ্যায়িত করা হয় ‘দ্বিতীয় সংসদ’। এখান থেকে নির্বাচিতরা শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশ পরিচালনার হাল ধরেন। কিন্তু কয়েক যুগ ধরে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ চালু না থাকায় জাতি এর সুফল থেকে বঞ্চিত।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সামরিক শাসকদের আমলেও দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নজির রয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ সামরিকতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের নতুন সোপানে পা রাখলেও অদৃশ্য কারণে রুদ্ধ হয়ে যায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন। গত ২৭ বছর ধরে যারা দেশ শাসন করছেন তারা নিজেদের গণতন্ত্রের সোল এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিলেও, গণতন্ত্র চর্চা ও প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব সৃষ্টির সূতিকাগার ছাত্র সংসদের নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখছেন গায়ের জোরে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে যে ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয় গণতান্ত্রিক শাসনামলেই। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় গণতন্ত্র চর্চায় প্রতিকূল আবহ সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্র সংসদের নির্বাচন শিক্ষাঙ্গনে যেমন গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ সৃষ্টি করত, তেমন পরিশীলিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টিতে অবদান রাখত। ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্বের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধ নেতৃত্বের বদলে আর্থিক পেশিশক্তির অধিকারীরা রাজনৈতিক অঙ্গনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সুযোগ পাচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞানার্জনের মূল ধারণাও উপেক্ষিত হচ্ছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে। জ্ঞানার্জনের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র-শিক্ষকের পারস্পরিক সহযোগিতায় পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও তা চলছে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই।

এক সময় মিনি পার্লামেন্ট হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট নির্বাচনের বিষয়টি এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। যা ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। সম্প্রতি সিনেট অধিবেশনে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে দাবী জানাতে গিয়ে শিক্ষকের হাতে ছাত্র, এমনকি ছাত্রের হাতেও শিক্ষক লাঞ্চিত হয়। যেই সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যজুয়েট প্রতিনিধি নাই। ছাত্র প্রতিনিধি নাই। অর্ধেকের বেশী আসন শূণ্য, সেটা সিনেট অধিবেশনের হয় কি করে? সিনেট অধিবেশন কি শুধু তিন সদস্য ভিসি প্যানেল নাম প্রস্তাবের জন্য ? দীর্ঘ ২৭ বছর সময় ধরে ডাকসু অকার্যকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন দিচ্ছে না প্রশাসন। ইতিপূর্বে নির্বাচনের দাবিতে উপাচার্যের কার্যালয়ে তালা, উকিল নোটিশ, মিছিল, মিটিং হয়েছে অনেক। ডাকসু নির্বাচন চেয়ে ব্যরিস্টার মনজিল মোর্শেদ হাইকোর্টে একটি রিটও দায়ের করেছিলেন কয়েকবছর পূর্বে। কিন্তু এতো কিছুর পরও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের টনক নড়েনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক, কর্মচারী থেকে শুরু করে সব নির্বাচনই হচ্ছে। কিন্তু হয় না ডাকসু নির্বাচন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী (১৯৭৩)। সিনেটে পাঁচজন ছাত্র প্রতিনিধি অংশগ্রহণের কথা থাকলেও ডাকসু বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই।

দেশের একমাত্র পাবলিক আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনবিহীন ২৫ বছর। নির্বাচন না হওয়ায় বিকল রয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)। এই দীর্ঘ সময় জাকসু না থাকায় ক্যাম্পাসে মন্থর হয়ে পড়েছে ছাত্র নেতৃত্ব। শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কোনো আন্দোলন না থাকায় চলছে অরাজকতা, হারিয়ে গেছে রাজনৈতিক সহাবস্থানের সংস্কৃতি। ১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় দুই বছর পর ১৯৭২ সালে প্রথম নির্বাচন হয় জাকসুর। পরবর্তীতে ১৯৭৪, ১৯৭৯, ১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ এবং ১৯৯২ সালে জাকসুর নির্বাচন হয়। জাকসুর প্রথম সহ-সভাপতি হিসেবে ছাত্রলীগের গোলাম মোরশেদ, সাধারণ সম্পাদক জিসাদের মুহাম্মদ রোকন উদ্দিন নির্বাচিত হন। গঠনতন্ত্রে প্রতিবছর নির্বাচনের কথা থাকলেও গত ৪৭ বছরে মাত্র নয়বার নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ণতা পেয়েছে জাকসু। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন মাসুদ হাসান তালুকদার এবং জিএস শামসুল তাবরীজ। এরপর আর কোন খবর নেই।

১৯৮৯ সালের পর আর কোনো নির্বাচন না হওয়ায় ২৭ বছর ধরে অচল রয়েছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। ১৯৫৭ সালের প্রথম দিকে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের যাত্রা শুরু। প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত মোট ১৪ বার রাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মাঝখানে অবশ্য ১৯৭০-৭২ পর্যন্ত রাকসুর কোনো নির্বাচন ছিল না। পরে ১৯৭৫-৮৮ পর্যন্ত সামরিক শাসনের কারণে রাকসু নির্বাচন ছিল বন্ধ। রাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৯-৯০ মেয়াদকালে। ওই নির্বাচনে ভিপি নির্বাচিত হন বিএনপির বর্তমান যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এবং জিএস নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের রুহুল কুদ্দুস বাবু। ওই নির্বাচনের পর থেকে আজ পর্যন্ত রাকসু ভবনে তালা।

চকসু নির্বাচন হয়েছে মোট ছয়বার। ১৯৭০ সালে প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ ইব্রাহিম এবং জিএস আবদুর রব। সর্বশেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনে তৎকালীন ছাত্রদল নেতা নাজিম উদ্দিন (ভিপি), আজিম উদ্দিন (জিএস) ও মাহবুবুর রহমান শামিম (এজিএস) নির্বাচিত হন। ২৭ বছর চকসু হিমাগারে। সম্প্রতি একাত্তর টিভির এক লাইভ অনুষ্ঠানে ভিসি ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। কোন গ্যাঞ্জাম হবে না স্ট্যাম্পে গ্যারান্টি দিলে তিনি বিষয়টি ভেবে দেখবেন! কিন্তু উত্তেজনা, সংঘাত, সংঘর্ষ যে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশে নির্বাচনের একটি অংশ এটা তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজো ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। কলেজ থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটিতে অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন। সাবেক রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের সামরিক শাসনামল ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়েছিল। সে সময় ভিপি লোটন ও জিএস জোটন দুই ভাই নির্বাচিত হয়ে দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় তোলে। অনেক ডাকসাইটের রাজনৈতিক নেতা এ ক্যাম্পাসেরই সৃষ্টি। গণতন্ত্রের জামানায় ছাত্র সংসদ কেনো উধাও হয়ে গেল? এ প্রশ্নের উত্তর অজানা।

দেশের ঐতিহ্যবাহী এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র সংসদ ও নেতৃত্বের ইতিহাস তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু বিগত তিন দশকে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ায় জাতীয় রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের শূন্যতা বিরাজমান! মেধাবীরা শিক্ষার্থীরা রাজনীতির ব্যাপারে আগ্রহী নন। ফলে ছাত্র রাজনীতি এখন সেবার পরিবর্তে টাকা বানানোর মেশিনে পরিণত। নীতি, নৈতিকতা, সমাজসেবাকে ভূলতে বসেছে ছাত্র সমাজ। তিনদশক ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাত্ররা কেন নিজেদের অধিকার ও ছাত্র সংসদের প্রশ্নে  রহস্যজনক নীরবতা পর্যালোচনার দাবী রাখে। অনেকের মতে এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক ষড়যন্ত্র। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ফেন্সিডাইল ও ইয়াবা সরবরাহের মাধ্যমে যুব সম্প্রদায়কে ঘুম পাড়িয়ে রাখার মতো গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত করছেন অনেকে। আবার বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করতে উগ্র মৌলবাদী রাজনীতি বিস্তৃতি ঘটানোর কুটকৌশলও এর নেপথ্যে কাজ করতে পারে। কারন, শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ্যধারার রাজনৈতিক চর্চার অভাব থাকলে শূন্যস্থান পূরণে অপরাজনীতি, জঙ্গীবাদ, মাদক গ্রাস করবে এটাই স্বাভাবিক। যা দেশের অগ্রযাত্রায় দাঁড়াবে বিষফোঁড়া হয়ে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে থেকে শুরু করে ৯০ এর স্বৈরাচার পতনসহ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রতিটি টার্নিং পয়েন্টে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে ছাত্র সমাজ তথা ছাত্র সংসদ। তাই এই ছাত্র সমাজ ঘুমপাড়িয়ে রাখতে গণতন্ত্রের জামানায় আওয়ামীলীগ-বিএনপি দু’দলই তাদের ছাত্র সংগঠনকে লাঠিয়ালের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে। বিএনপির শাসনামলে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধিপাত্য ছিলো ছাত্রদলের। আওয়ামীলীগের জামানায় একক কর্তৃত্ব ছাত্রলীগের। ছাত্র সমাজের অধিকার ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ঠ কর্মকান্ডের  পরিবর্তে তারা চাদাবাজী, টেন্ডারবাজী, সন্ত্রাস ইত্যাদির আশ্রয়ে কোটিপতি হওয়ার ধান্দায় ব্যস্ত। তাই ছাত্র সংসদ নিয়ে ভাবার সময় কোথায়! যা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে ছাত্ররাজনীতিকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের শূন্যতায় জাতীয় রাজনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ব্যাপক ভাবে। যা দেশের উন্নয়ন তথা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এর দায়ভার আওয়ামীলীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া কোনভাবে এড়াতে পারবেন না। রাহুর কবলে পতিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে এই শনিরদশা মুক্ত করতে একমাত্র দু’নেত্রীই পারেন জোতিষির ভূমিকায় অবতীর্ন হতে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

(8)

LaksamDotKom
By LaksamDotKom আগস্ট ১৯, ২০১৭ ০৮:১৯
Write a comment

No Comments

No Comments Yet!

Let me tell You a sad story ! There are no comments yet, but You can be first one to comment this article.

Write a comment
View comments

Write a comment

Leave a Reply